.............. ................ ................... ................... নরসিংদীর  নদ-নদী

নরসিংদীর নদী

সরু ফিতার মতো দেখতে এই পানির প্রবাহটা পাহাড়িয়া নদীর। এটির অবস্থান নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলায় ।

সরকার আদম আলী : সপ্ত নদীর পলি মাটিতে গড়ে উঠা গাঙ্গেয় উপত্যকা নরসিংদীর সবকটি নদ-নদীই এখন পানিশূন্য প্রায় খালে পরিণত হয়েছে। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, হাড়িধোয়া, পাহাড়িয়া ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীর গভীরতা আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে নদীর প্রশস্ততা। এসব নদ-নদীর ৩৪৫৯৬ বর্গকিলোমিটার অববাহিকার ২৪ লাখ মানুষের মধ্যে এখন পানি জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ সেচ সংকট। স্রোতের অভাবে নদ-নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এর উপর নদ-নদীর পানি, মাটি বায়ু দূষণে কমে যাচ্ছে গবাদিপশু, জলজ প্রাণী, পাখ-পাখালী, উদ্ভিদকূলের শত শত প্রজাতি। নদী অববাহিকায় জন্ম নিয়েও নরসিংদীর বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ সেচের পানি পাচ্ছে না। গোসলের পানি পাচ্ছে না। পাচ্ছে না বিশুদ্ধ খাবার পানি।
নরসিংদীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীর মূল ভারতের বরাক, বাংলাদেশের সুরমা কুশিয়ারা কালনী নদী। এই মেঘনা নদীর নরসিংদী অংশের ৪৫ কিলোমিটার এলাকার বেশির ভাগ এলাকাই শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। ভৈরব থেকে আড়াই হাজারের গোপালদী পর্যন্ত যেসব এলাকা নদীর প্রশস্ততা রয়েছে সেসব এলাকাও ছোট ছোট ডুবোচরে ভরে গেছে। অধিকাংশ এলাকা মাছের খাইরের কারণে পলি বালি জমে লম্বা লম্বা চরার সৃষ্টি হয়েছে। মেঘনা নদীর প্রশস্ততা ছিল ১৫০০ মিটার। গভীরতা ছিল ২৫ মিটার। বর্ষা মওসুমে এই নদীটি প্রতি সেকেন্ডে ১৬৫৬৮ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হতো। শুষ্ক মওসুমে প্রবাহিত ১০৫ ঘনমিটার পানি। ভারত বরাক নদীর পানি ভিন্ন পথে প্রবাহিত কারণে সুরমা কুশিয়ারা কালনী নদীর ্রােত কমে গেছে। সেই সাথে কমে গেছে মেঘনার প্রবাহ। গত দশকাধিককালে মেঘনা ্রােতধারা ক্ষীর্ণ হয়ে দিন দিন গভীরতা প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে মেঘনার প্রবাহ কমে ৮০ ঘনমিটারেরও নিচে নেমে গেছে। মূল নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই মেঘনার কয়েকটি শাখা উপ-নদী শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে শত শত শ্যালো টিউবওয়েল। এসব শাখা নদী উপ-নদী অববাহিকায় চাষাবাদ মারাত্মকভাবে বিঘি হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে অধিক খাদ্য ফলাও কর্মসূচি। কমে যাচ্ছে খাদ্য পাদন। নরসিংদী জেলা দিন দিন ঘাটতি এলাকায় পরিণত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী এলাকার গভীর নলকূপ দিয়েও মেঘনা পানির ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। নরসিংদীর মাধবদী, শেখেরচর, পাঁচদোনা, চৌয়ালা, হাজীপুর নরসিংদী শহরের শিল্পবর্জ্যের কারণে মেঘনার টলটলে স্বচ্ছ পানির রং বদলে কালো হয়ে গেছে। শহর সংলগ্ন মেঘনা শাখার পানিতে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পবর্জ্যের বিষাক্ত হাড়িধোয়া নদীর পানি, বানিয়ার খালের পানিসহ নরসিংদী শহরের ৮টি সোয়ারেজসহ /১০টি ড্রেনের দূষিত পানির কারণে মেঘনা তলদেশের কাঁদাও বিষাক্ত হয়ে গেছে। করিমপুর থেকে গোপালদী পর্যন্ত কমবেশী ১০ কিলোমিটার মেঘনায় একেবারেই দূষিত হয়ে পড়েছে। এই মেঘনা শাখায় মাছের সংখ্যা ১০ ভাগেরও নিচে নেমে গেছে।
শীতলক্ষ্যা নদীটি একটি স্থানীয় নদী হলেও এর হচ্ছে একটি বহির্মুখী আন্তজার্তিক নদ। পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ বানার নদী মিলিত স্রোতধারা থেকে এই শীতলক্ষ্যা সৃষ্টি হয়েছে। এর সাথে রয়েছে তুরাগ বালু নদীর ্রােতধারা। সস্থল থেকে ৭৩ কিলোমিটার লম্বা শীতলক্ষ্যা নদীর ৩৫ কিলোমিটার এলাকাই নরসিংদীর উপর দিয়ে বয়ে গেছে। এই নদীকে ঘিরে শিবপুর পলাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচ ব্যবস্থাসহ পশ্চিমে গাজীপুরের কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ রূপগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকার চাষাবাদ পরিচালিত হতো। পুরনো ব্রহ্মপুত্রসহ সনদীসমূহের স্রোতধারা ক্ষীর্ণ হয়ে পড়ায় এই নদীর নাব্য দিন দিন বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খর্রােতা নদী হিসেবে পরিচিত শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে বর্ষা মওসুমে প্রতি সেকেন্ডে ২৭৪২ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হতো। এই নদীর গভীরতা ছিল ১৪ মিটার। কিন্তু বর্তমানে নদীর নাব্য হ্রাস পেয়ে শুষ্ক মওসুমে এর পানির প্রবাহের পরিমাণ ১০০ ঘনমিটারেও নিচে নেমে গেছে। সস্থলে এই প্রবাহ আরো অনেক কম বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শুষ্ক মওসুমে কোন এলাকায় গভীরতা / মিটারে নেমে গেছে। যার ফলে নরসিংদী গাজীপুর নারায়ণগঞ্জের বিশাল এলাকা মারাত্মক সেচ সংকট দেখা দিয়েছে। শীতলক্ষা নদী থেকে সৃষ্ট বহুসংখ্যক খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। শীতলক্ষ্যা অববাহিকার মানুষ মারাত্মক পানি সংকটে পতিত হয়েছে। নরসিংদী জেলার উত্তর সীমানায় রয়েছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে সৃষ্ট এই ব্রহ্মপুত্র নদ পতিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের মেঘনা নদীতে। একটি শাখা প্রবাহিত হয়েছে নরসিংদী জেলার মনোহরদী কটিয়াদীর মাঝখান দিয়ে শিবপুর পর্যন্ত। নরসিংদী জেলায় এই নদী রয়েছে ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। নদ ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ ১৭ শতকে ভূমিকম্পের পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের এই অংশ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই নদী ছিল খুবই খর্রােতা। জানা যায়, এই নদী দিয়ে এক সময় জাহাজ চলাচল করত। নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র শুকিয়ে এখন ক্ষুদে নালায় পরিণত হয়েছে। বর্ষাকালে এই নদীর পানির প্রবাহ ছিল ২৫০০ ঘনমিটার, গভীরতা ছিল সাড়ে মিটার। শুষ্ক মওসুমে যেখানে ৩০ ঘনমিটার পানি প্রবাহ ছিল সেখানে বর্তমানে ঘনমিটার পানিও প্রবাহিত হয় না। এই নদের তলদেশে বর্তমানে ধান চাষাবাদ হলেও এই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠা সেচ ব্যবস্থা একেবারেই অচল হয়ে পড়েছে। এই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকেই নরসিংদীর মনোহরদী, বেলাব, শিবপুর রায়পুরা উপজেলার উপর দিয়ে ৩৩ কিলোমিটার লম্বা আড়িয়াল খাঁ নদ। মনোহরদী ড্রেনেরঘাট সৃষ্টি হয়ে রায়পুরার নলবাটা এলাকায় গিয়ে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। স্বাধীনতার পূর্বপর সময়েও এই নদী দিয়ে নৌযান চলাচল করত। এই নদীকে ঘিরে বেলাব, রায়পুরা শিবপুরের কয়েকটি বড় বড় বাজার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই নদী দিয়েই এলাকায় পাদিত ধান, পাট, চাল, শাকসবজি বিভিন্ন এলাকা থেকে নরসিংদীসহ রাজধানী ঢাকায় প্রেরণ করা হতো। নদীসমূহের প্রবাহ কমে যাওয়ায় এই খর্রােতা আড়িয়াল খাঁ নদও শুকিয়ে গেছে। কোন কোন এলাকায় এর গভীরতা এক দেড় ফুটে নেমে এসেছে। কোনো কোনো এলাকায় একটি সাধারণ ড্রেনে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মওসুমে এই নদ নিয়ে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না। এই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠা যুগ যুগের সেচ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে শ্যালো টিউবওয়েল। পানির অভাবে ইরি-বোরো ধান শাক-সবজি চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই নদীর প্রশস্ততা ছিল ১৫০ মিটার, গভীরতা ছিল ১৬ মিটার আর অববাহিকা এলাকা ছিল ১৫০ বর্গকিলোমিটার। বর্ষা মওসুমে এই নদের পানি প্রবাহের পরিমান ছিল ২৫০০ ঘনমিটার। বর্তমানে তা কমে ২০ ঘনমিটারে দাঁড়িয়েছে।
এই আড়িয়াল খাঁ নদ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে ২২ কিলোমিটার লম্বা ১০০ মিটার প্রশস্থ মিটার গভীরতা বিশিষ্ট নরসিংদীর পাহাড়িয়া নদী। বিগত স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এই নদীটি প্রবাহ কমে বর্তমানে ক্ষুদে নালায় পরিণত হয়েছে। পাহাড়ী নদী বিধায় এই নদীর ১০০ বর্গকিলোমিটার অববাহিকার চাষাবাদ ছিল পরিপূর্ণ সেচনির্ভর। এই নদীর পানিতেই নরসিংদীর বিপুল পরিমাণ শাকসবজি পাদিত হতো। নদীটি শুকিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার কৃষক মারাত্মক সেচ সংকটে পতিত হয়েছে। শাক-সবজির আবাদ আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
শীতলক্ষ্রার ্রােতধারা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল নরসিংদীর হাড়িধোয়া নদী। শিবপুরের আলীনগর এলাকা থেকে সৃষ্টি হয়ে শিবপুর, নরসিংদীর উপর দিয়ে গড়িয়ে শহরের থানার ঘাট হাজীপুরের মধ্য দিয়ে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটার লম্বা এই নদীটি এখন একটি বিষাক্ত নদী হিসেবে পরিচিত। মূল নদী শীতলক্ষার ্রােতধারা ক্ষীর্ণ হয়ে পড়ায় এই নদীর প্রবাহ কমে গেছে। শুষ্ক মওসুমে নালার মতো কিছু কালো বিষাক্ত পানি প্রবাহিত হয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, এই নদীর প্রশস্ততা ছিল ১২০মিটার, গভীরতা ১০ মিটার, বর্ষা মওসুমে এই নদী দিয়ে ১৫০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হতো। বর্তমানে তা কমে ঘনমিটারেরও নিচে নেমে গেছে। এখন যা প্রবাহিত হয় তা সবই শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে। এই নদীর ১০০ বর্গকিলোমিটার অববাহিকায় সেচ, গোসল সুপেয় পানির তীব্র সংকট বিরাজ করছে। এই নদীর অববাহিকায় এখন ধান, চাল, শাক-সবজি যাই পাদিত হচ্ছে তার সবগুলোর মধ্যেই রয়েছে ক্ষতিকর বিষ। এই বিষ দূষিত করছে পানি, মাটি বায়ু

নরসিংদীর নদ-নদীই এখন পানিশূন্য

Copyright 2021 www.narsingdibd.com Concept : Mohammad Obydullah.01674605316. All Rights Reserved.Email: info@narsingdibd.com.