.............. ................ ................... ................... নরসিংদীর  নদ-নদী

নরসিংদীর নদী

 

 

বিষাক্ত বর্জ্যে নরসিংদীর নদ-নদী সয়লাব

দেশের দীর্ঘতম নদী ব্রহ্মপুত্র, অন্যতম মেঘনা আর শীতলক্ষ্যায় বেষ্টিত নরসিংদী জেলাটি। নরসিংদী জেলার পশ্চিমাংশে পলাশের সীমানা দিয়ে বেষ্টিত শীতলক্ষ্যা আর নরসিংদী ও বৃহত্তর রায়পুরার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে দেশের অন্যতম নদী মেঘনা। দেশের দীর্ঘতম ব্রহ্মপুত্র নদী মেঘনা থেকে উৎপত্তি হয়ে জেলার ভেতরে একাধিকবার  আঁকাবাঁকা হয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে সংযোগ হয়েছে। এ মেঘনা ও শীতলক্ষ্যায় একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়া যেত। শুধু ইলিশ কেন সব প্রকার দেশীয় মাছও পাওয়া যেত যা দিয়ে জেলার মানুষ মাছের চাহিদা নিবারণ করত। কয়েক হাজার জেলেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু আজ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে নরসিংদীর কিছু প্রভাশালী ব্যবসায়ী কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে দেশের দীর্ঘতম ব্রহ্মপুত্রের নরসিংদীর অংশে হাড়িধোয়া ও আড়িয়ালখাঁ দখল করে ফেলেছে। আর তাদের কারখানার বর্জ্য ফেলে নদীগুলো আজ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় নরসিংদীর অধিকাংশ কলকারখানা নদীকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যার অধিকাংশ কারখানায়ই বর্জ্য পরিশোধনাগার প্রকল্পি (ইটিপি) নাই। যার কারণে বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাসহ সব কারখানার বর্জ্য ও কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানি নিজস্ব পাকা ড্রেনের মাধ্যমে নদীগুলোতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে অনবরত। যারফলে একদিকে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে অন্য দিকে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে নদীতে মাছ শূন্য হয়ে পরেছে। ফলে নদীর মাছ খাওয়া এখন দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয় এমনকি কোনো মানুষ গোসল করা-তো দূরের কথা কোন পশু-পাখিও যদি এ নদীর পানি পান করে তাহলে পশু পাখির মৃত্যু অনিবার্য্য। কোনো মানুষ যদি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে বাধ্য হয়ে নদীতে নামতে যায় তাহলে তার গায়ে খুজলি-পাঁচরাসহ এমনকি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে জানিয়েছেন নরসিংদী জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান।
সরেজমিন দেখা গেছে নরসিংদীর বৈশাখী স্পিনিং মিল, নদী বাংলার আবেদ টেক্সটাইল, এ থ্রি কালার ক্যাম হাড়িধোঁয়ার অনেকাংশে দখল করে কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়া পাকিজা গ্রুপ, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, শাহ আমানত স্পিনিং মিল, তিথি টেক্সটাইল, আলাউদ্দিন টেক্সটাইল মিলস, হামিদ ফেব্রিক্স ব্রহ্মপুত্র দখল করে তাদের কারখানা নির্মাণ করেন। দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পলাশের বাগপাড়ায় কারখানার অভ্যন্তরে সরকারের কাছ থেকে ২ বিঘা জমি গোচারণ ভূমির জন্য ২ বছরের জন্য লিজ নেয় কিন্তু সেখানে সরকারিভাবে পরিদর্শন করে কোনো গোচারণ ভূমি নেই তাতে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান নির্মাণ দেখে লিজ বাতিল করে দিলেও পরবর্তিতে প্রশাসন আর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এছাড়া প্রাণ ফুড শীতলক্ষ্যার প্রায় অধিকাংশ দখল করে ইমারত নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানসহ সমশের জুট মিলস, মদিনা জুট মিলস, জনতা জুট মিলস, ঘোড়াশাল ও পলাশ সারকারখানার উচ্ছিষ্ট গরম পানি শীতলক্ষ্যায় প্রেরণ, স্যামরি ডাইং কেমিক্যালসহ মাধবদী ও সেখেরচর এলাকার অধিকাংশ কলকারখানার বর্জ্য ও কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানি নদীতে ফেলছে। এতে করে একদিকে নদী ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে মাছশূন্য হচ্ছে নদীগুলো। শুধু তাইনয়, এতেকরে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মধ্যে পরেছে বলে জানিয়েছেন নরসিংদীর পরিবেশবাদী সংগঠন এমডিএস ও পিএমএসটিসি।
নরসিংদীতে কলকারখানার এসব অনৈতিক কাজের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের নরসিংদী জেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা সিনিয়র কেমিস্ট মো. আতাউর রহমান বলেন,  নরসিংদীতে যে কয়টি কারখানার মালিক তারা অধিকাংশই কোন না কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই নরসিংদী ও ঢাকা অফিসের কর্মকর্তা যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে সম্প্রতি নরসিংদীর নদী বাংলা গ্রুপের ৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকাসহ পলাশের স্যামরী ডাইং কেমিক্যাল, প্রাণ কোম্পানি, হামিদ ফেব্রিক্স, বৈশাখী স্পিনিং মিলসসহ বেশ কয়েটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রায় কোটি টাকার জরিমানা আদায় করা হয়েছে। নরসিংদী জেলার প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালেদ আহম্মেদ লিংকন নরসিংদীর নদীগুলোর পরিবেশ বিষয়ে বলেন, এ কারখানাগুলো বেশিরভাগই নদীকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে।
যারা এগুলো করেছেন তারা প্রত্যেকেই এক একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। যারফলে প্রশাসন এ বিষয়ে শক্ত কোনো ভূমিকা পালন করছে না। মাঝে মধ্যে ঢাকা থেকে পরিবেশ অধিদফতরের লোকজন এসে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করলেও সংঘটিত অপরাধগুলো থেমে নেই। তাই নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে প্রশাসনের শক্ত ভূমিকার প্রয়োজন এবং জরিমানার পাশাপাশি অবৈধ দখলমুক্ত করে নদীতে যেন কোনো বর্জ্য ও কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানি ফেলা না হয় তার জন্য প্রতিটি কারখানাকে বাধ্যতামূলক ভাবে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনে জোড় দিতে হবে। তাহলেই এ পরিবেশ কিছুটা ফিরে আসতে পারে। নরসিংদীর নদীসহ সরকারী জমি দখল থেকে উদ্ধার ও কলকারখানার বর্জ্য এবং কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানি নদীতে ফেলার বিষয়ে জেলা প্রশাসকের মাসিক নিয়মিত সভায় একাধিকবার আলোচনা হলেও কোনো কর্মকর্তাই এ বিষয়ে এগিয়ে আসেননি।

 
বিষাক্ত বর্জ্যে নরসিংদীর নদ-নদী সয়লাব

Copyright 2021 www.narsingdibd.com Concept : Mohammad Obydullah.01674605316. All Rights Reserved.Email: info@narsingdibd.com.