.............. ................ ................... ................... নরসিংদীর  নদ-নদী

নরসিংদীর নদী

সরু ফিতার মতো দেখতে এই পানির প্রবাহটা পাহাড়িয়া নদীর। এটির অবস্থান নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলায় ।

খরস্রোতা নরসিংদীর আড়িয়ালখা বুকে ফসলের মাঠ

নরসিংদীর আড়িয়ালখার বুকে জেগে উঠেছে চর। ফলে এককালের খরস্রোতা এ নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দুই তীরে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। আর এ চরের জমিতে চলছে চাষাবাদ। নদীর বুকে এখন সবুজের সমারোহ। স্থানীয়রা প্রতিযোগিতা করে দখল করছে বালুচর। এই চরের জমি প্রস্তুত করে ফসল ফলাতে ব্যস্ত রয়েছে। ফলে বদলে যাচ্ছে নদীর চিরচেনা রূপ। এক দশকের ব্যবধানে প্রবাহমান আড়িয়ালখা নদীটি শুকিয়ে যৌবনহারা মরা খালে পরিনত হয়েছে । এক সময়ের খরস্রোতা আড়িয়ালখার বোবা কান্না উপলব্ধিরও যেন কেউ নেই !

সরেজমিনে দেখা গেছে, নরসিংদীর মেঘনা নদীর উত্তর পাশদিয়ে নলবাটা থেকে আড়িয়ালখা নদীর উৎপত্তি। উত্তর পূর্বদিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রায়পুরা উপজেলা,শিবপুর হয়ে বেলাব উপজেলা দিয়ে মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। এক সময় এ নদী ছিলো নরসিংদীর ৬টি উপজেলাসহ পাশ্ববর্তী জেলার ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যের মুল চালিকা শক্তি। নদী পথে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্যসহ জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা ছিল নদীটির।

পাশাপাশি নদী পাড়ের কৃষি জমিগুলো যেমন ছিলো ফসলে ভরা, তেমনি নদীর পানিতে ছিলো প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছের ছড়াছড়ি। স্থানীয় জেলেরা নদীতে মাছ ধরে জীর্বিকা নির্ভর করতেন। এখন নদীর গভীরতা হ্রাস পেয়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে উধাও হয়েছে নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ, তার সঙ্গে যেন এসব জেলেদের জীবনের গতিও ক্ষীণ হয়ে গেছে।

এ নদীকে কেন্দ্র করে ১৯১২ সালে নদীর পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৬০সালে হাসনাবাদ তাঁতী বাজার, হাসনাবাদ বাজারে স্থাপন করা হয় প্রায় ১০ হাজার পাওয়ারলুমসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ১৯৮২ সালে হ্যান্ডলুম সার্ভিস সেন্টার, পরে পর্যায়ক্রমে হাসনাবাদ ছন্দা সিনেমা হল, একটি সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, হাসনাবাদ পাবলিক লাইব্রেরী, রহিমাবাদ বাজার, সিরাজ নগর উম্মুকুড়া দাখিল মাদ্রাসা ও রাধাগঞ্জ বাজার। শুধু তাই নয় নদীকে নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক ড.আব্দুল হাই সিদ্দিকী লিখেছেন মেঘনার পাড়ে আড়িয়ালখার ধারে নামে একটি কাব্যগন্থ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নদীটি খনন না করায় আস্তে আস্তে নদীটি মরে ছোট একটি খালে পরিনত হয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণ লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেলেও আড়িয়ালখার পানির জৌলুস থাকতো গ্রীষ্মমৌসুম জুড়েও। কিন্তু এখন শুষ্কমৌসুম শুরু হতে না হতেই নদীর বুকে জেগে ওঠে একের পর এক ধু-ধু চর। নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে নদীর মাঝে জেগে ওঠা চরে স্থানীয়রা এখন বোরোর আবাদ করছেন। যার ফলে ফসলের মাঠে পরিনত হয়েছে আড়িয়ালখা নদীটি। এটা যে একটা নদী দূর থেকে তা চেনাই বড় দায়।

স্থানীয়রা আরো জানায়, আড়িয়ালখা নদীতে সব সময়ই ৪০ থেকে ৬০ হাত পানি থাকতো। নদীর দুই পাড়ে মাঝিরা নৌকা দিয়ে মানুষ পাড়া পাড় করতেন। এখন এসব আর নেই, ভরাট হয়ে গেছে নদী। বর্তমানে নদীতে মাত্র ৪-৫ ফিট পানি রয়েছে। এখন যোগাযোগের সুবিধার্থে নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে ৬টি বড় ব্রিজ। যদিও ব্রীজের নীচে এখন বিভিন্ন প্রকার ফসলের আবাদ হয়।

রহিমাবাদ গ্রামের সুধীর বর্মন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ নদীতে মাছ ধরেই পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, এখন নদীতে পানি না থাকার কারনে মাছও নেই। তাই বাধ্য হয়ে তিনি এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় যাবার চিন্তা করছেন। স্থানীয় কৃষক আহাম্মদ আলী বলেন,এক সময় নদীতে পর্যাপ্ত পানি ছিল। সেই পানি ব্যবহার করে আমরা চাষাবাদ করেছি। এখন নদীর পানি শুকিয়ে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চর জেগে উঠেছে। একই কারণে অন্যান্য পানির উৎসগুলোতেও পানির স্তর কমে গেছে। এতে কৃষির উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। অন্যদিকে নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় এলাকার মৎস্য শিকারীদের চলছে দুর্দিন।

হাসনাবাদ পাবলিক লাইব্রেবীর প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাফিজুর রহমান মামুন জানান, এক সময়ে এ আড়িয়ালখার নদী দিয়ে চলতো যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পালতোলা অনেক নৌকা। জেলেরা মাছ ধরে অনেক সংসার চালাতো, পাওয়া যেত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এখন সবুজ ফসলের মাঠ দেখে কেউ ভুলেও ভাববে না এক সময় এটি খরস্রোতা নদী ছিল। এখন পরিণত হয়েছে মরা খালে, চাষ হচ্ছে বিভিন্ন ফসল। আমাদের দাবী নদীটি খুব দ্রুত খননের ব্যবস্থা করে তার আগের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার।

আমীরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এম.মোজাম্মেল হক বলেন, আড়িয়ালখা নদীটি এক সময় নরসিংদীসহ রায়পুরা উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র ছিল। যা ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের মুল চালিকা শক্তি। কিন্তু দীর্ঘ দিন যাবৎ নদীটি খনন না কারায় তা ভরাট হয়ে তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। আমি বন্যা মুক্ত প্রকল্প নামে ২০০৮ সালে একটি বাধ নির্মাণে প্রস্তাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডে দিয়ে ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে অর্থের অভাবে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

সরকার যদি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের আওতায় এনে দীর্ঘ স্থায়ীভাবে নদীটি খনন করে তাহলে একদিকে নদীটি যেমন রক্ষা পারে। অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও উপকৃত হবে। যে নদী প্রাচীনকালে নরসিংদীবাসীর মানবসভ্যতা গড়ে তুললে সাহায্য করেছিল সেই নদীর সাহায্যে এখন যেন কেউ নেই। যৌবন-জৌলুস হারিয়ে আড়িয়ালখার বুকে এখন বোবা কান্না ! কিছু প্রকৃতিপ্রেমিক এ নদীর কান্না শুনতে পেলেও কিছু স্বার্থানেষী মহল এ নদীর বুকের ওপর চেপে বসেছে। তারা নদীর বুকে চাষাবাদ ও পাড়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান করে আস্তে আস্তে দখলে নিয়েছে। সুজলা-সুফলা বাংলা মায়ের কোলজুড়ে এ নদীর অনাধিকাল যাতে বয়ে চলে এ আশা স্থানীয়দের। তাই এ নদীর বিপন্নদশা কাটাতে হলে ড্রেজিং করা জরুরি।

 

খরস্রোতা নরসিংদীর আড়িয়ালখা বুকে ফসলের মাঠ

Copyright 2021 www.narsingdibd.com Concept : Mohammad Obydullah.01674605316. All Rights Reserved.Email: info@narsingdibd.com.