মোঘল, ইংরেজ, মাড়োয়ারী ও বাঙালী শাসকদের রসনা তৃপ্ত করে
নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী সাগর কলা এখন বিলুপ্তির পথে
 সরকার আদম আলী

          বাল্যকালে জঙ্গলে বানরের দখল থেকে হলদে পাকা বন্যকলা খেয়ে কলার প্রকৃত স্বাদ পেয়েছি কিশোর বয়সে ভূগোল থেকে জানতে পেরেছি নরসিংদীর কলার সুখ্যাতির কথা তরুণ বয়সে কারারচরে খালার বাড়ি যাওয়া আসার মধ্যে কলার বিশাল বিশাল বাগান দেখেছি কলার চাষাবাদ দেখেছি জেনেছি কলা সম্পর্কে বহু তথ্যাদি বড় হয়ে তৎকালীন ঢাকা বিভাগের কমিশনার জানে আলম খানের রসপূর্ণ বক্তৃতায় শুনেছি নরসিংদীর কলার সুখ্যাতি, স্বাদ, গন্ধ, গুণাগুণ ও কদরের কথা নরসিংদীর কলার স্বাদ গ্রহণ করেনি মোঘল-বাংলার, বৃটিশ-বাংলা, ভারত-বাংলা, পাক-বাংলা কথা বাংলাদেশের এমন কোন শাসকের কথা জানা যায়নি ঢাকার নবাবদের প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় নরসিংদীর কলা ছিল অত্যবশ্যকীয় ফল জানা যায় নবাবরা মূলত: কাশ্মিরী বংশোদ্ভুত বলে তারা ফল বেশি ভাল বাস নরসিংদীর কলা স্বাদ, গন্ধ, রং ও আকারে সুন্দর ছিল বলে তারা প্রাত্যহিক খাবার তালিকায় নরসিংদীর কলাকে বেছে নিয়েছিল এর আগে ঢাকায় নিযুক্ত ২৯ জন মোগল সুবেদার, ৪৮ জন ইংরেজ লর্ড সহ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সকল শাসকদেরই নরসিংদীর কলা সরবরাহ করা  হতো শুধু তাই নয় রাষ্ট্রীয় অতিথিদেরকে নরসিংদীর কলা দিয়ে অতিথিদেরকে নরসিংদীর কলা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো বিদেশী বণিকরাও শখ করে নরসিংদীর কলা কিনে নিতো দেশ বিদেশে নরসিংদীর কলার এতো কদরের কারণেই পাটের পরেই নরসিংদীর মানুষের দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল ছিল কলা কলা চাষাবাদকে কেন্দ্র করে নরসিংদীর স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি অর্থনৈতিক বুনিয়াদ রচিত হয়েছিল কলা কখন থেকে নরসিংদীতে চাষাবাদ শুরু হয় তা জানা যায়নি তবে ভূতত্ত্ববিদদের মতে নরসিংদী পাহাড়ী ও সমতল ভূমির বয়স কমবেশী ১০ হাজার বছর কলার উৎপত্তিস্থল যেহেতু এশিয়া সেহেতু কৃষির প্রারম্ভিকতা থেকেই সম্ভবত: নরসিংদীতে কলার চাষাবাদ হতো কৃষিতাত্বিকদের মতো ধান চাষাবাদের সমসাময়িক কাল থেকে নরসিংদীতে কলা চাষাবাদ হয়ে থাকতে পারে প্রাপ্ত তথ্যমতে বৃটিশ শাসনামলে প্রথম দিকে বর্তমানে নরসিংদী জেলার ৬ টি উপজেলায় কমবেশী ৪ হাজার হেক্টর জমিতে কলা চাষাবাদ হতো তার মধ্যে অন্তত ৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হতো সবরী, কবরী, চাম্পা, চিনি চম্পা, অগ্নিসাগর ইত্যাদি কলা উৎপাদন হতো অন্ত:ত ৮০ ল টন কলা ওসব কলা চাষাবাদে ও ব্যবসার সাথে সাথে পরো প্রত্যভাবে এক/দেড় ল মানুষ জাড়িত ছিল উৎপাদিত কলা নরসিংদী থেকে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানী করা হতো কলা রফতানীর জন্য পাকিস্তান শাসনামলে বাংলাদেশের রেলওয়ের একটি লোকাল ট্রেনের নামকরণ করা হয়েছিল কলার গাড়ি প্রতিদিন বিকেলে নরসিংদী জেলার দৌলতকান্দী, শ্রীনিধি, মেথিকান্দা, খানাবাড়ী, আমীরগঞ্জ, নরসিংদী, জিনারদি ঘোড়াশাল ইত্যাদি রেল স্টেশনে হাজার হাজার টুকরী কলা জমা হতো সন্ধ্যার পর কলার গাড়ীতে তুলে এসব কলা রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো এছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেল লাইনে চলাচলকারী প্রতিটি ট্রেনেই কলার বাগি থাকত এছাড়া পাকা কলার টুকরী নিয়ে প্রতিদিন শত শত হকার বিভিন্ন ট্রেনে নরসিংদীর কলা বিক্রি করতো দেশের বিভিন্ন এলাকার ট্রেনযাত্রীরা নরসিংদীর কলা খেয়ে উদর পূর্তি করতো এছাড়া লঞ্চ, ষ্টিমারে বসেও একইভাবে নরসিংদী পাকা কলা বিক্রি হতো নতুন জামাইরা ডাউস সাইজের হলদে পাকা সাগর, সবরী কলার কাদি নিয়ে শ্বশুর বাড়ীর কদর পেতো উৎপাদিত কলা যে শুধু বিক্রি করা হতো তা নয়, পরিশ্রমী চাষীরা নিজেরাও কলা খেতো চিকিৎসকদের মতো পরিশ্রমী মানুষের জন্য পাকা কলা খুবই উপকারী পাকা কলায় প্রচুর ক্যালরী থাকার কারণে কলা পরিশ্রমী মানুষের শরীরে শক্তি যোগায় একথা পুরনো দিনের মানুষেরা ও জনতো বাগানে কলা পাকলে চাষীরা আস্ত কলার ছড়ি কেটে মেয়ের জামাইর বাড়ী পাঠাতো জামাই ও আত্মীয় স্বজনের জন্য তৈরি করতো নানা ধরণের পিঠা কলার অতিরিক্ত পুষ্টি ও ঔষধি গুণ থাকার কারণে চাষীরা ভাতের সম্পূরক হিসেবে কবিরাজরা রোগীদেরকে কলা খাওয়ার পরামর্শ দিতো এছাড়া অতিরিক্ত দুধের আশায় চাষীরা দুধেল গাভীকে পাকা কলা খেতে দিতো কলার বহুবিধ ব্যবহারের জন্যই নরসিংদীর মানুষ পাহাড়ী ও সমতল ভূমিতে মনের আনন্দে কলা চাষ করতো সবচেয়ে বেশি কলা চাষ হতো মনোহরদী উপজেলায় সেখানকার কলা বেচাকেনার জন্য কলার কয়েকটি বাজারও রয়েছে চালাকচর, সাগরদী, মনোহরদী, হাতিরদিয়া ইত্যাদি কয়েকটি বাজারে শত শত টন কলা আমদানী হতো এসব বাজার থেকে ট্রাক ভর্তি করে কলা যেতো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পলাশের চরসিন্দুর, গজারিয়া, তালতলী, পারুলিয়া, কালির বাজার, রাবান বাজার, চরনগরদী নরসিংদীর ভাটপাড়া, শীলমান্দী, শিবপুরের ফতেপুর, সিএনবি, পালপাড়ো ইত্যাদি বাজারে প্রতিদিন প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার টন কলা আমদানি হতো আর একইভাবে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে রফতানী হতো এখন নরসিংদীর কলার সেই সুদিন নেই কলা চাষ এখন য়ীষ্ণু পর্যায়ে উপনীত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত চাষাবাদ, সার কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি, রাসায়নিক সার প্রয়োগ জমির গুণাগুণ বিনষ্ট এবং সর্বোপরী সরকারী ঋণ ও পৃষ্টপোষণের অভাবে কলা চাষের এরিয়া দিন দিন কমে যাচ্ছে কমে যাচ্ছে কলার উৎপাদন বিশেষ করে দেশি জাতের সুস্বাদু সুগন্ধী সাগর কলার উৎপাদন কমে গেছে আশংকাজনকভাবে দেশি সাগর কলার স্থান দখল করেছে নেপালী সাগর কলা কোন কোন এলাকায় চাষাবাদ হচ্ছে চম্পা ও সবরী কলা কিন্তু চাষীরা কাঙ্খিত উৎপাদন পাচ্ছে না কয়েকজন কলার চাষীর সাথে কথা বলে জানা গেছে কলা চাষের জন্য যে বেলে দুআশ মাটির প্রয়োজন সেই মাটি এখন আর নেই অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটি শক্ত হয়ে গেছে এখন দেশী সাগর কলার রোপন করলে গাছ যেমন বড় হয়না তেমনি কলার ছড়িতেও কাদি বেশী হয়না কলাও আকারে বড় হয় কম এছাড়া কলার ছড়িতে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশী দেখা দেয় এ অবস্থায় চাষীরা পরপর কয়েক বছর লোকসান গুনার পর দেশী জাতের সাগর কলার চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছে একাধারে কয়েক বছর চম্পা, সবরী ও গেরা (বাংলা) কলা চাষের পর এখন নেপালী সাগর কলা চাষাবাদ করেছে চাষীরা বলেছে নেপালী সাগর কলা চাষাবাদ করেছে চাষীরা বলেছে নেপালী সাগর কলার মান খুবই কম কলার স্বাদ দেশী সাগর কলার মতো মিষ্টি না অনেক টকমিষ্টি স্বাদের তাছাড়া নেপালী কলার গন্ধ ও ততটা ভাল না বাজারে নেপালী কলার চাহিদাও কম দামও কম চাষীরা অনন্যোপায় হয়ে ওসব নেপালী কলার চাষাবাদ করছে সচেতন চাষীরা বলছে দেশী জাতের সাগর কলা আমাদের ঐতিহ্য এ কলার জাত সংরণে কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটকে কাজ করতে হবে গবেষকরা যদি নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে দেশি জাতের সাগর কলার উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করতে পারে তবেই নতুন করে চাষীরা কলা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবে নরসিংদীর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে মাটির গুণাগুণ বিনষ্টের কারণেই দেশিজাতের কলা চাষাবাদের এরিয়া দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়েছে নরসিংদী জেলার বর্তমানে মাত্র ১৩৫০ একর জমিতে কলা চাষাবাদ হচ্ছে এতে দেশী জাতের সাগর কলা একেবারেই কম বেশীর ভাগ কলাই নেপালীকলা এরপর রয়েছে চম্পা, সবরী, কবরী ইত্যাদি কলা নেপালী কলা স্বাদে গন্ধে বেশি ভাল না হলেও ফলনে বেশ ভাল এবং রোগ বালাই কম তবে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি না করা গেলে কোন জাতের কলার চাষাবাদই ধরে রাখা যাবে না এ ব্যাপারে নরসিংদী সচেতন কৃষি গবেষকরা বলেছে, নরসিংদীর দেশিজাতের সাগর কলার ইতিহাস ঐতিহ্য এবং এর জাতগত বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখতে হলে সরকারকেই চাষীদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে নতুবা এই ঐতিহ্যবাহী সাগর কলা একদিন বিদেশিদের সম্পদে পরিণত হয়ে যাবে পরিণত হবে পেটেট ফলে

লেখক পরিচিতি ঃ সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, জেলা সংবাদদাতা, দৈনিক ইনকিলাব

Copyright 2012 www.narsingdibd.com Aestheticsand Mohammad Obydullah. All Rights Reserved.Email: info@narsingdibd.com.