.............. ................ ................... ................... নরসিংদীর লুঙ্গি
   

 

 

তাঁতের লুঙ্গির জন্য বিখ্যাত নরসিংদীনরসিংদীর তাঁতের তৈরি লুঙ্গি সারাদেশে সমাদৃত ছিলরাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, দিনাজপুর, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ সহ সারাদেশ থেকে পাইকারি ক্রেতারা শেখেরচর ও মাধবদী বাবুরহাটে এসে সপ্তাহের প্রতি সোম ও মঙ্গলবার ট্রাকভর্তি করে তাঁতের লুঙ্গি নিয়ে যেতেনএই তাঁতের লুঙ্গি দেশের চাহিদা মিটিয়ে সুদূর ইউরোপ সহ এশিয়ার বাঁজারে লুঙ্গি রপ্তানি করা হয়২০০০ সালে থেকে দেশের প্রথম লুঙ্গি বিদেশে লুঙ্গি রপ্তানি শুরু করেবর্তমানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, দুবাই, বাহরাইন ও মিয়ানমারে লুঙ্গি রপ্তানি করছেবাজার ধরতে ভিনদেশি লুঙ্গি তৈরি করেই রপ্তানি করা হচ্ছে গত বছর প্রায় ১৫ লাখ ডলারের লুঙ্গি রপ্তানি করে তবে প্রতিবছরই বাড়ছে রপ্তানির পরিমাণ

কিন্তু আজ হস্তচালিত সেই তাঁতের জায়গা দখল করে নিয়েছে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুমতাঁতের লুঙ্গি এখন আর বাজারে খুব একটা নেইমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা তাঁতিদের দাদন দিয়ে লুঙ্গির বাজার একচেটিয়া দখলে নিয়েছে তাঁতিরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেপক্ষান্তরে ওইসব ব্যবসায়ী দাদনের লুঙ্গি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেনএ অবস্থায় পাওয়ারলুম দখল করে নিয়েছে হস্তচালিত তাঁতের লুঙ্গি তথা তাঁতের কাপড়ের বাজার সম্প্রতি শেখেরচর বাবুরহাটে গিয়ে দেখা গেছে, অল্প সংখ্যক তাঁতি হস্তচালিত তাঁতের কিছু লুঙ্গি নিয়ে বসে আছেনতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুমের কাপড়ের চাপে তাদের ত্রাহি অবস্থাপাওয়ারলুমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে হস্তচালিত তাঁতিরা বাজারে টিকতে পারছেন নাঅত্যন্ত নিম্নবিত্তের কিছু তাঁতি অনেক কষ্ট করে হস্তচালিত তাঁতের লুঙ্গিকে ধরে রেখেছেননরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার চরসুবুদ্দি, হাইরমারা, নিলক্ষা, নলবাটা, কাট্টাখালি, মণিপুরা, নরসিংদী সদরের সাটিরপাড়া, রাঙ্গামাটি, হাজিপুর, ঘোড়াদিয়া, করিমপুর, নজরপুর, বাবুরহাট (শেখেরচর), মাধবদী, কৌলানপুর, ভাটপাড়া, ভগীরথপুর এবং পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল, পাইকশা, সানের বাড়ি এলাকায় এখনও কিছু কিছু তাঁতি হস্তচালিত তাঁতের লুঙ্গি তৈরি করছেনতবে এসব এলাকা থেকেই কিছু কিছু তাঁতের লুঙ্গি বাজারে আসছেশৌখিন ক্রেতারা এখনও তাঁতের লুঙ্গিই খোঁজেনকারণ পাওয়ারলুমের লুঙ্গির চেয়ে তাঁতের লুঙ্গি পরতে আরামদায়ক বাংলাদেশের ও আমাদের নরসিংদীর লুঙ্গির মান বিশ্বসেরাএখনো বিশ্বের অনেক দেশের নারী-পুরুষ লুঙ্গি পরে ফলে লুঙ্গি শিল্পে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছেসরকার যদি রপ্তানিতে ভর্তুকি ও উৎপাদনে ব্যবহৃত কেমিক্যাল শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা দেয়, তবে তৈরি পোশাকের মতো লুঙ্গিও হতে পারে রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত

একসময় স্থানীয় তাঁতের লুঙ্গির কোনো ব্র্যান্ড ছিল নাএখন ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি হচ্ছে বিদেশি চেইনশপেও একসময় নামে-বেনামে বিক্রি হওয়া লুঙ্গি এখন পরিচিতি পাচ্ছে নিজস্ব ব্র্যান্ডে দেশে প্রথম লুঙ্গির ব্র্যান্ডিং শুরু করে হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স ট্রেডমার্ক লাইসেন্স নিয়ে ১৯৯৩ সালে স্ট্যান্ডার্ড এবং আমানত শাহ লুঙ্গি ব্র্যান্ডিং শুরু করেএরই ধারাবাহিকতায় পরে এটিএম, অনুসন্ধান, পাকিজা, বোখারি, অমরসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শুরু করে লুঙ্গির ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশের লুঙ্গি রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের প্রায় ২১টি দেশেএমনকি লুঙ্গি পরা নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ঢাকার রাস্তায় হয়েছে 'লুঙ্গি মার্চ' রাজধানীর বারিধারা আবাসিক সোসাইটি গত বছর এপ্রিল মাসে লুঙ্গি পরে আবাসিক এলাকায় রিকশা চালানোসহ চলাফেরা নিষিদ্ধ করেএর প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 'লুঙ্গি মার্চের' ডাক দিয়ে বনানী মাঠে জড়ো হয় কয়েক শ তরুণ-তরুণীতারা লুঙ্গি পরে বারিধারা সোসাইটির দিকে এগোতে থাকেযদিও পুলিশের কারণে তারা বেশি দূর যেতে পারেনিওই সময় আন্দোলনকারীরা লুঙ্গিকে জাতীয় পোশাকের মর্যাদা দেওয়ার দাবি করেছিলেন

পুরুষরা লুঙ্গি পরা বাদ দিলে এর বিক্রি কমে যাওয়ার কথাকিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, লুঙ্গি বিক্রি আগের চেয়ে বেড়েছেউৎপাদন বাড়ায় বিদেশ থেকে আমদানির বদলে এখন দেশীয় কম্পানিগুলোই প্রয়োজনীয় উৎপাদন করছেনতাঁরা বিদেশেও রপ্তানি করছেন বাংলাদেশের লুঙ্গিএমনকি লুঙ্গি আকৃষ্ট করেছে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাবি্লউ মজিনাকেওলুঙ্গি পরে পরিবারসহ রিকশায় চড়ে ছবি তুলেছেন তিনি

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে লুঙ্গির বাজারেররং ও ডিজাইনে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে লুঙ্গি সবার কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানতবে লুঙ্গি এখন শুধু বাঙালি পুরুষের পোশাকই নয়, গুণ-মান এবং ভালো ডিজাইনের কারণে বাংলাদেশের লুঙ্গির দিকে এখন নজর বিদেশিদেরওব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের লুঙ্গির মান সবচেয়ে ভালোরপ্তানিতেও অনেক সাড়া পাওয়া যাচ্ছেসরকারি সহযোগিতা পেলে তৈরি পোশাকের পর লুঙ্গি দিয়েই বিশ্ববাজারে নতুন জায়গা করে নেওয়া যাবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা

যুগ যুগ ধরেই বাঙালি পুরুষদের নিত্যদিনের পোশাক লুঙ্গিঢিলেঢালা এবং আরামদায়ক হওয়ায় শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিদেশেও লুঙ্গির চাহিদা বাড়ছেতবে প্রাচ্যের সংস্কৃতির কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে লুঙ্গির কদর কম তাই লুঙ্গির ব্যবহার বাড়াতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের লক্ষ্য করে এগোচ্ছে আমানত শাহ গ্রুপপৃথিবীর অনেক দেশের-নারীরা লুঙ্গি পরেএরই ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশের নারীদের জন্য চারং নামে এক ধরনের লুঙ্গি তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই করছে আমানত শাহ গ্রুপহেলাল মিয়া জানান, নারীদের মধ্যে চারং জনপ্রিয় করতে বিভিন্ন প্রচারণার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদেরআশা করছি, কিছুদিনের মধ্যেই পুরুষের পাশাপাশি বাঙালি নারীরাও চারং পরবে

লুঙ্গির আদি উদ্ভব বাংলাদেশে নয়ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের 'ভেস্তি' নামক এক ধরনের পোশাক থেকে লুঙ্গির উদ্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয় বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ায় লুঙ্গির প্রচলন আছে কোনো কোনো দেশে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও লুঙ্গি পরে ভারতের কেরালা, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে লুঙ্গির মতো পোশাক প্রচলন আছেযেগুলোকে স্থানীয় বিভিন্ন নামে ডাকা হয়মিয়ানমারে লুঙ্গিকে লোঙ্গাই নামে ডাকা হয়ইয়েমেনে লুঙ্গির মতো পোশাককে বলা হয় 'মা আউইস'

লুঙ্গি বাংলাদেশে একটি অনানুষ্ঠানিক পোশাক হিসেবে দেশে প্রচলিত অন্যান্য অনেক দেশে সুতা ও জরির কাজ করা লুঙ্গি অনুষ্ঠানেও পরা হয় দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে লুঙ্গি মুণ্ডু নামে পরিচিত এ অঞ্চলে ধুতির বদলে একসময় লুঙ্গি পরা শুরু হলেও তা অনুষ্ঠানে পরার স্বীকৃতি পায়নি তবে বাংলাদেশে পুরনো ঢাকাসহ অনেক এলাকার লুঙ্গিপ্রিয় মানুষ সব অনুষ্ঠানে লুঙ্গি পরে যেতে অস্বস্তি বোধ করে না পুরান ঢাকা ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ ব্যবসায়ীরা দামি লুঙ্গি পরে গদিতে বসেনগ্রামাঞ্চলে প্যান্ট শুধু উঠতি বয়সের তরুণ ও চাকরিজীবীরা পড়েনঅন্য সব পেশাজীবীর মানুষ পরে লুঙ্গিআর লুঙ্গি মানেই বাবুরহাটের লুঙ্গিগুণে-মানে ভালো থাকায় ক্রেতাদের কাছে বাবুরহাটের লুঙ্গির কদর ব্যাপক

লুঙ্গি আবিষ্কারের কাহিনীটা কেউ জানেন? বেশ মজার কাহিনী কিন্ত পড়ুন তাহলে,....
বার্মায় এক রাজা রাজদরবারে মন্ত্রীদের সাথে বৈঠকে বসেছেনহঠাৎ তাঁর প্রচন্ড
টয়লেট চাপলোতাই তিনি মন্ত্রীদের ৫ মিনিট অপেক্ষা করার কথা বলে টয়লেটে গেলেন কিন্তু সমস্যা হল পাজামার গিট খুলছিলোনা প্যাচিয়ে গেছেএমতাবস্থায় পাজামা খোলতে না পেরে বাধ্য হয়েই পাজামা পরেই অবস্থায় কাজ সারতে হলোপাজামায় মল-মূত্র লেপ্টে থাকায় তিনি বের হতেও পারছিলেননা টয়লেটে বসেই মনস্থ করলেন দর্জিকে বলবেন যে এমন একটি পাজামা বানাতে যাতে করে পাজামার গিট প্যাচিয়ে গেলেও টয়লেট করতে সমস্যা না হয় অতঃপর রাজার ব্যাক্তিগত দর্জি অনেক চিন্তা-ভাবনা করে একটি পাজামার মডেল আবিষ্কার করলেন সেই মডেলটি হলো লুঙ্গি

 বর্তমানে বিভিন্ন মানের লুঙ্গি ২৫০ থেকে দুই হাজার ১৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে একসময় নামে-বেনামে লুঙ্গি বিক্রি হতোসেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স লুঙ্গিকে প্রথম স্ট্যান্ডার্ড ও আমানত শাহ নামে ব্র্যান্ডিং শুরু করেএই লড়াইয়ে আমরা অনেকটা সফল হয়েছি দেশের লুঙ্গির বাজার প্রসঙ্গে আমানত শাহ গ্রুপের কর্ণধার বলেন, দেশের প্রায় চার কোটি লোক লুঙ্গি পরেপ্রতিজন যদি দুটি করেও লুঙ্গি পরে তাহলে বার্ষিক চাহিদা প্রায় আট কোটি পিস লুঙ্গিআগে দেশের এই বিশাল লুঙ্গির চাহিদা মেটাতে স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ভারত ও মিয়ানমার থেকে লুঙ্গি আমদানি করা হতোকিন্তু বর্তমানে দেশের পুরো চাহিদা পূরণ করছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো

তিনি বলেন, ২০০০ সালে থেকে দেশের প্রথম লুঙ্গি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমানত শাহ গ্রুপ বিদেশে লুঙ্গি রপ্তানি শুরু করেবর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, দুবাই, বাহরাইন ও মিয়ানমারে লুঙ্গি রপ্তানি করছেবাজার ধরতে ভিনদেশি লুঙ্গি তৈরি করেই রপ্তানি করা হচ্ছেগত বছর প্রায় ১৫ লাখ ডলারের লুঙ্গি রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটিতবে প্রতিবছরই বাড়ছে রপ্তানির পরিমাণ

নরসিংদীর তথা বাংলাদেশের লুঙ্গির মান বিশ্বসেরাএখনো বিশ্বের অনেক দেশের নারী-পুরুষ লুঙ্গি পরেফলে লুঙ্গিশিল্পে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছেসরকার যদি রপ্তানিতে ভর্তুকি ও উৎপাদনে ব্যবহৃত কেমিক্যাল শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা দেয়, তবে তৈরি পোশাকের মতো লুঙ্গিও হতে পারে রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত 

এখনো দাপটেই আছে আমাদের নরসিংদীর লুঙ্গি

[ - মোহাম্মদ উবাইদুল্লাহ ]

Copyright 2021 www.narsingdibd.com Concept : Mohammad Obydullah. All Rights Reserved.Email: info@narsingdibd.com.