.............. ................ ................... ................... ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা (নরসিংদী )
   

 

নরসিংদী শহরের কাউরিয়াপাড়া এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা বসে সপ্তাহব্যাপী এ মেলায় পুণ্যস্নান, মহাযজ্ঞ ও পূজা-অর্চনায় যোগ দিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে বাউল ও পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে দেশ-বিদেশের বাউলদের গানে ও পূর্ণাথীদের ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠে নরসিংদীর মেঘনা নদীর তীরে বাউল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা হিন্দু ধর্মালম্বীদের দেবতা ব্রহ্মার পূজায় (মহাযজ্ঞ) হাজার হাজার নারী-পুরুষ অংশ নেয়তারা দেশ ও নিজের কল্যাণসহ মনোবাসনা পূরণের জন্য উপবাস থেকে গঙ্গায় (মেঘনা) পূন্যস্নান করে মহাযজ্ঞে অংশ নেয়বাউল সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ৭শ বছর ধরে মাঘী পুর্নিমায় এই মেলার আয়োজন করা হয়

 মেলায় যোগ দেয় আমেরিকা এবং ভারতের কলকাতা, আসাম ও ত্রিপুরার শতাধিক বাউল বাউল মেলায় গিয়ে দেখা যায়, শহরের কাউরিয়াপাড়ার নরসিংদীর লঞ্চঘাটের পাশে মেঘনা নদীর তীর বাউল ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠে পাশেই বাউল সম্প্রদায়ের আখড়া ও মন্দির বাউল ঠাকুরের মন্দিরে তাঁর ভক্তরা ঘি-প্রদীপ, মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে পূজা দেয়

নরসিংদী শহরে বাউলবাড়ি সম্পর্কে কেউ তেমন কিছু জানুক আর না-ই জানুক, বাউল ডাক্তারকে সবাই চেনে বাউল ডাক্তারের নাম ছিল শ্রী মনিন্দ্র বাউল তিনি সারাজীবন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেছেন মানবসেবাকে ব্রত করে তিনি জয় করেছেন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার হৃদয় ২০০৩ সালে তার কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে বাউল বাড়িতেই রয়েছে তার সমাধি বাউলবাড়ি বাউল ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু বাউল ধর্মের কিছু দর্শন আছে যার মধ্যে সংস্কার দেহ মানে নিজের হাত-মুখ চোখ আগে সংস্কার করতে হবে আগে নিজেকে সংস্কার করে তারপর সংস্কারের কাজে হাত দিতে হবে বাউলদের পোশাক হবে সাধারণ জীবনের প্রয়োজনে তারা অল্পেই সন্তুষ্ট হবে তামসিক জিনিস পরিহার করে সাত্তি্বক নিয়ে চলবে তবে সেই হবে সত্য মানুষ বাউল ধর্মের গুরু হলেন বাউল ঠাকুর

বাউল আখড়ার সেবায়েত ডা. প্রাণেশ কুমার বাউল ঝন্টু জানান, সব ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে মনের মিলন ঘটানোর জন্য বাউল ঠাকুরের নরসিংদীতে আবির্ভাব ঘটে প্রতিবছর এ মেলায় ভক্তদের মধ্যে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে ভালোবাসার সৃষ্টি ও ধরণীর মঙ্গলার্থে প্রকৃতি পূজার ধর্ম প্রচার করা হয় সকাল ৯টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত দেবতা ব্রহ্মার পূজা (যজ্ঞ) অনুষ্ঠিত হয় এতে ভক্তরা উপবাস থেকে গঙ্গায় (মেঘনা) পুণ্যস্নান করে যজ্ঞানুষ্ঠানে অংশ নেয় এ ছাড়া জগন্নাথের মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয় সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত আগত বাউলশিল্পীরা বাউলসংগীত পরিবেশন করেন
 

পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী এ বাউলমেলাকে ঘিরে আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয় কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যাতে না ঘটে সে জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়

অনুষ্ঠানকে ঘিরে মেঘনা নদীর পার ঘেষে জমে উঠে বিশাল মেলামেলায় কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প, কাঠ-বাঁশ ও মাটির তৈরী কুটির শিল্পসামগ্রী লৌহজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, মিষ্টির দোকানসহ অগণিত দোকানে মহিলা-শিশুসহ সবাই কেনাকাটা করে এছাড়াও চরক-দোলাসহ রয়েছে নানা বিনোদন মূলক রাইড গুলোতে থাকে উপচে পড়া ভিড়

নরসিংদী শহরে কাউরিয়া পাড়ায় মেঘনার তীরে যেখানে বাউল মেলার আয়োজন করা  হয় সেই পাড়াটির নাম বাউল পাড়া মানে বাউল বাড়ি এখানে রয়েছে শ্রী শ্রী বাউল ঠাকুরের আখড়া ধাম নরসিংদী শহরের কাউরিয়াপাড়ার বাউলবাড়ি প্রবেশ করেই বুঝতে পারলাম মেলার আমেজে পুরো বাউল বাড়িজুড়ে যেন ভিন্ন আমেজ বিদ্যমান শান্ত, সৌম্য ও অপরূপা নদী মেঘনার মনোরম পরিবেশে অনাবিল শান্তির পরশধারায় বাউলবাড়ি ও তাদের ধর্মদর্শন আমাদের কাছে একেবারেই নতুন মেলার মূল আকর্ষণ বাউল গানের আসর এখনো শুরু হয়নি তাই আমরা বাউল বাড়ি ঘুরে দেখতে লাগলাম দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাউল ভক্তরা এসেছেন কেউবা এসেছেন পরিবার পরিজন নিয়ে বাউল বাড়ির বেশ কয়েকটি ঘরেই তাদের আবাসস্থল মেলা চলাকালীন এখানেই তারা অবস্থান করবেন প্রতিবেলা সবার জন্যই রান্নার আয়োজন হয় এ জন্য খাবার নিয়ে তাদের নিয়ে কোনো চিন্তা নেই বাউল ভক্ত নারী-পুরুষ ও অতিথিসহ সবাই একসঙ্গে বসে সেবা (খাবার) গ্রহণ করেন বাউল বাড়ি ঘুরে দেখা গেল ভক্তদের কেউ রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত কেউবা মেঘনা নদীতে পুণ্যস্নান করে বাউল সাধক শ্রীরামদাস বাউলের সমাধিতে প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন এরই ফাঁকে কথা হয় বাউল মেলার বর্তমান সেবায়ক ডা. সাধন বাউলের সঙ্গে বাউল সাধকরা নিজেদের সেবায়ক পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন মেলার উদ্দেশ্য নিয়ে জানতে চাইলে তিনি হাসিমুখে জানালেন_ বাউল ভক্তসহ সব মানুষের চেতনায় মানবতাবোধ জাগ্রত করাই বাউল মেলার মূল লক্ষ্য সঙ্গে যোগ করলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য এই মেলা উন্মুক্ত এছাড়াও এই বাউল মেলার আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এখানে আগত ভক্তবৃন্দ কোনো প্রকারের নেশাজাতীয় কিছু গ্রহণ করেন না


দুপর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে বাউলগান ও যজ্ঞ উৎসব একে একে আসতে থাকেন আমন্ত্রিত অতিথি এবং বাউল ভক্ত তারপর ভক্তরা সংগীত পরিবেশন করেন একের পর এক চলতে থাকে বাউলদের রচিত কালজয়ী সব গানগুলো বাউলদের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যেমন একতারা, দোতারা, ডুগি, প্রেমজুড়ি বা কাঠজুড়ি, মন্দিরার তবে এসব গানের সঙ্গে আমাদের অন্য বাউল গানের পার্থক্য রয়েছে এখানে সবাই গায়ক আবার সবাই শ্রোতা                              [ -মোহাম্মদ উবাইদুল্লাহ ]

নরসিংদীর মেঘনার তীরে ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা

Copyright 2021 www.narsingdibd.com Concept : Mohammad Obydullah. All Rights Reserved.Email: info@narsingdibd.com.