.............. ................ ................... ................... নরসিংদীর শহীদ মিনার
   

মানুষের সাথে মানুষের ভাব বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। শুধু মানুষ কেন সৃষ্টি জগতের তাবৎ প্রাণীদের মাঝে একে অপরের সাথে কুশল বিনিময়ের মাধ্যম ভাষা। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে পৃথিবীতে এমন ইতিহাস বিরল। ফেব্রুয়ারি এলেই খু-উ-ব মনে পড়ে বায়ান্নর কথা, অমর একুশের কথা। মনে পড়ার সঙ্গত কারণ এই যে, বায়ান্নর অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের বদৌলতেই আমরা বাংলাকে পেয়েছি মাতৃভাষারূপে। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বে ছোট-বড় মিলে ৭ হাজার ২১১টি ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। তার মধ্যে একমাত্র বাংলা ভাষা, যে ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য বীর বাঙালি অকাতরে বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এটা বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, সর্বোপরি জাতি হিসেবে নিঃসন্দেহে আমাদের অনেক গর্বের বিষয়। ১৯৯৮ সালে কানাডায় বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। কিন্তু গর্বের স্তুতিসৌধ নির্মিত হয়েছে এমন অনেক উৎপাদন ও ব্যক্তি কালপরিক্রমায় বিস্মৃত প্রায়।

 

মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন নরসিংদীর শিবপুরের শহীদ আসাদুজ্জামান আসাদ। তিনিও এদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে তত্কালীন ছাত্রসমাজের ৬ দফা ও ১১ দফা দাবি আন্দোলনের রাজপথের লড়াকু সৈনিক। আইয়ূব বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৬৯ সনের ২০ জানুয়ারি ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

 

তত্কালীন পাকিস্তান আমলে নরসিংদীর ন্যাপ নেতা মরহুম আবুল হাসিম মিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম মুসলেহ উদ্দিন ভুঁইয়া, মরহুম মোঃ মতিউর রহমান, শিবপুরের মরহুম আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, মরহুম রবিউল আউয়াল খান কিরন, ফজলুর রহমান ফটিক মাস্টার, মনোহরদীর ভাষা সৈনিক মরহুম আব্দুস সাত্তার পন্ডিত, সাবেক এমপি মরহুম শহিদুল্লাহ ভুইয়া, আব্দুল আওয়াল শেখ, মরহুম সিরাজুল হক, মরহুম নাজিম উদ্দিন সরকার, মরহুম আব্দুল মান্নান বিটি, মরহুম হাফিজ উদ্দিন উকিল, মরহুম আব্দুল হেকিম, আব্দুল আউয়াল শেখ, বেলাব উপজেলার মরহুম কমরেট আব্দুল হাই, মরহুম সমসের আলী ভুঁইয়া, রায়পুরা উপজেলার মরহুম আফতাব উদ্দিন ভুঁইয়া, মরহুম ফজলুল হক খন্দকার, মরহুম সাদত আলী, পলাশ উপজেলার প্রয়াত বিজয় চেটার্জি, মরহুম আহাম্মেদুল কবির প্রমুখ ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কমিউনিস্ট নেতা প্রয়াত অন্নদা পাল ও মরহুম ফয়েজ মাস্টার ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তত্কালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কমিউনিস্ট নেতা জিতেন ঘোষ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রহিমাবাদে অবস্থান করে তাদের পার্টির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এখানে প্রয়াত ত্রৈলক্য নাথ চক্রবর্তী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মরহুম মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড তোহায়াসহ প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা নিরাপদে থেকে তত্কালীন সময়ে তাদের পার্টির গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনের সৃষ্টি।
 

নরসিংদী শহরের ব্রাহ্মন্দীতে অবস্থিত নরসিংদী সরকারি কলেজ শহীদ মিনারটি নরসিংদীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। নরসিংদীর কেন্দ্রীয় ও প্রথম এ শহীদ মিনারটি স্থাপিত হয় ১৯৬২ সালে। তাত্কালীন রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতৃবৃন্দের সহায়তায় নরসিংদী কলেজ কর্তৃপক্ষ এ শহীদ মিনার নির্মাণ করে।

১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতৃবৃন্দের সহায়তায় নরসিংদী শহরের ঐতিহ্যবাহী সাটির পাড়া স্কুল প্রাঙ্গণেও গড়ে উঠে আরো একটি শহীদ মিনার। ১৯৭২ সালে তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী নরসিংদী সরকারি কলেজের শহীদ মিনারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মত প্রায় সকল স্থানে একই আকৃতির শহীদ মিনার স্থাপিত হয়। নরসিংদী জেলায় মোট ৫৬৮টি শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে। এরমধ্যে নরসিংদী সদরে ৯৮টি, রায়পুরায় ১০৭টি, বেলাবতে ৬৯টি, মনোহরদীতে ১০৯টি, শিবপুরে ১১৭টি ও পলাশে ৬৮টি শহীদ মিনার রয়েছে।

নরসিংদী জেলার অধিকাংশ স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার রয়েছে। নরসিংদী সরকারি কলেজে জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হলেও নরসিংদী জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন স্থানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০০৯ সালে অপর একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। তৎকালিন নরসিংদী জেলা প্রশাসক অমৃত বাড়ৈ বলেন, প্রশাসনের উদ্যোগে মুসলেহ উদ্দিন ভূইয়া স্টেডিয়াম সংলগ্ন স্থানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নিলে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। এ কারণে আমরা এটিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বলছি না। তবে সময়ের বিবর্তনে এটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে যাবে। নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নরসিংদীর সর্বস্তরের মানুষ কলেজের শহীদ মিনারকে কেন্দ্রীয় হিসেবে জেনে আসছে। শহরে একাধিক শহীদ মিনার হলেও কলেজের শহীদ মিনারটি সবার হৃদয়ে কেন্দ্রীয় হিসেবে ধারণ করে রয়েছে।মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি হাছান মাহমুদ সনেট বলেন, শহীদ মিনার নিয়ে আমাদের বিভক্ত না হয়ে একত্র হওয়া উচিত। এর জন্য প্রশাসন, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষাজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, যেহেতু নরসিংদীতে সম্মিলিতভাবে নির্দিষ্ট স্থানে কোনো শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি তাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নিয়ে কোনো বিতর্ক করা উচিত নয়। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সব শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের সম্মান জানিয়ে আসছে।

 

 ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে নরসিংদীর আইডিয়াল হাই স্কুলে আরো একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। তৎকালিন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক মোঃ ওবায়দুল আজম ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মনজুর এলাহীর অর্থায়নে এ শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। গত ২১ জানুয়ারি শহীদ মিনারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোঃ ওবায়দুল আজম। এ নিয়ে জেলায় এ পর্যন্ত মোট ৫৮৮টি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী সাটির পাড়া কালী কুমার উচ্চ বিদ্যালয়, নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ, ব্রাহ্মন্দী কে কে এম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, শিবপুর শহীদ আসাদ সরকারি কলেজ, রায়পুরা ডিগ্রী কলেজ, আদিয়াবাদ ইসলামীয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, বালুয়াকান্দী উচ্চ বিদ্যালয়, মনোহরদীর হাতিরদিয়া রাজি উদ্দিন কলেজ, এস আলী উচ্চ বিদ্যালয়, মনোহরদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মনোহরদী গার্ল্স পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, নরসিংদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, বেলাব হাই স্কুল, ঘোড়াশাল উচ্চ বিদ্যালয়, পলাশ শিল্পাঞ্চল কলেজ, মাধবদী কলেজ, আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ, পাঁচদোনা স্যার কেজি গুপ্ত উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্য স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শহীদ মিনারে প্রতি বছর শহীদ দিবস উপলক্ষে নগ্ন পদে প্রভাত ফেরী, বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে পুষ্পাঞ্জলী প্রদান করে ।

নরসিংদী সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সুর্যকান্ত দাস, অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা মিয়া, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী, আব্দুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা, হাতিরদিয়া রাজিউদ্দিন ডিগ্রী কলেজের অধ্যাপক মোঃ মোমিনুল ইসলাম কাঞ্চন, শিবপুর শহীদ সরকারি আসাদ কলেজের অধ্যক্ষ হাসনা হেনা, শহীদ আসাদ গালর্্স স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হারিছ রিকাবদার প্রমুখ মহান ভাষা আন্দোলনে বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ২১-এর চেতনায় জাতিকে উজ্জীবিত করে আগামীর পথে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।

 

 

 

নরসিংদীর শহীদ মিনার

- মোহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

Copyright 2021 www.narsingdibd.com Concept : Mohammad Obydullah. All Rights Reserved.Email: info@narsingdibd.com.